শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

sakarya escort sakarya escort sakarya escort serdivan escort webmaster forum

serdivan escort serdivan escort serdivan escort hendek escort ferizli escort geyve escort akyazı escort karasu escort sapanca escort

মানিকগঞ্জে ‘তেরশ্রী গণহত্যা’ দিবস পালিত

আমিনুল ইসলাম রুদ্র
  • আপডেট : সোমবার, ২২ নভেম্বর, ২০২১
  • ১৫৮ বার পঠিত
মানিকগঞ্জে তেরশ্রী গণহত্যা দিবস পালিত

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ‘তেরশ্রী গণহত্যা’ দিবস আজ। ১৯৭১ সালে ২২ নভেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এ দেশীয় দোসরা তেরশ্রী, সেনপাড়া, বড়রিয়া এবং বড়বিলা গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালায়। নির্বিচারে গুলি, বেয়নেট চার্জ ও বাড়িঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে তেরশ্রী জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী, অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।

প্রতি বছরের ন্যায় যথাযথ মর্যাদায় আজ (২২ নভেম্বর সোমবার) দিবসটি পালিত হয়। সকাল আটটায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে পতাকা উত্তোলন ও স্মৃতি স্তম্ভে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে শহীদদের প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে সর্বস্তরের জনগণ। শহীদ জমিদার সিদ্ধেশ্বর রায় প্রসাদ চৌধুরীর উত্তরসূরি সমেশ্বর রায় প্রসাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এসময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ।

পয়লা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ হারুন অর রশিদ এর সঞ্চালনায় এসময় উপস্থিত ছিলেন- মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোঃ গোলাম আজাদ খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডঃ আব্দুস সালাম, ঘিওর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোঃ হাবিবুর রহমান হাবিব, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) ওয়াদিয়া শাবাব, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানিয়া সুলতানা, ঘিওর থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বিপ্লবসহ মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও এলাকার নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ।
তেরশ্রী গণহত্যা দিবস
কেন এই হত্যাযজ্ঞ?
সেজন্য আমাদের একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রাচীনকাল থেকেই তেরশ্রী এলাকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৪২ সালের পর ঢাকা শহরের বাইরে দুটি কলেজ ছিল। তার একটি মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, অপরটি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রীতে ’তেরশ্রী কলেজ’। পরে নানা ঘটনার মাধ্যমে তেরশ্রী কলেজ মানিকগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে ’সরকারি দেবেন্দ্র’ কলেজ নামে জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সমহিমায় উজ্জ্বল। দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন শোষণের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়। পাক শাসক গোষ্ঠী একই কায়দায় বাঙ্গালীদের ভাষা, জাতিগত শোষণ ও বৈষম্য অব্যাহত রাখে।

পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে দেশব্যাপী যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে ওঠে তার প্রভাব ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জেও এসে পড়ে। মানিকগঞ্জে গঠিত হয় মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ’মাতৃভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ’। মূলত মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এপার ওপার বাংলার বিপ্লবী পুরুষ ডা. এমএন নন্দী, তার ভাই প্রমথ নাথ নন্দী ও আফসার উদ্দিন মাস্টারের প্রেরণায় আন্দোলন ক্রমশ ত্বরান্বিত হতে থাকে। মানিকগঞ্জ ’মাতৃভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ’ এর মাধ্যমে পরে জেলার সকল প্রগতিশীল ছাত্র ও ব্যক্তি আন্দোলনে যোগ দেয়।

১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি পুলিশ প্রশাসন তেরশ্রী কেএন ইনস্টিটিউশন ৪ (চার) শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে। তেরশ্রী অঞ্চলের কৃষক জনগণের মাধ্যমে ঘিওর হাটে ইজারদারদের বিরুদ্ধে এক সময় গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে তেরশ্রী অঞ্চলের লোকজন ঢাকার গভর্ণর সোলায়মান খানের বাসভবন ঘেরাও করে পায়ে হেটে গিয়ে।

ব্রিটিশ পুলিশের কাছে তেরশ্রী ছিল রেড এরিয়া অর্থাৎ কমিউনিস্ট এলাকা। কারণ তেরশ্রী গ্রামেই জন্ম নিয়েছেন-বাংলার অসাম্প্রদায়িক মানবদরদী ডা. এমএন নন্দী (মন্মথ নন্দী), জন্ম নিয়েছেন চিরকুমার আমৃত্যু বিপ্লবী অধ্যক্ষ পমথ নাথ নন্দী যিনি রেড নন্দী হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। মূলত তার প্রচেষ্টাতেই জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, ডা. এমএন নন্দী, আফসার উদ্দিন মাস্টার, আব্দুর রহমান ঠাকুর, আ. হাকিম, মিরান মাস্টার, ডা. মোবারক আলী, মন্তোষ কুমার পাল, বিজয় চন্দ্র শীল প্রমুখের উদ্যোগে এবং সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে মেহনতি মানুষের মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় তেরশ্রী গ্রাম।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরশ লাগে তেরশ্রী গ্রামেও। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে আব্দুর রহমান ঠাকুর, আফছার উদ্দিন মাস্টার, আব্দুল হাকিম, আব্দুল মতিন প্রমুখ ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সাল, শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ বাঙালির প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় প্রিয় স্বাধীনতা। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী, মিলিটারি, তাদের সহযোগী শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হত্যা, খুন, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ-অত্যাচারের যত রকম পন্থা আছে, তারা তা অবলম্বন করে, বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিঃচিহ্ন করার জন্য। সারা বাংলাদেশের মত পর্যায়ক্রমে এই মানবতাবিরোধী অপরাধ যজ্ঞের শিকার হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোক বর্তিকা গ্রাম তেরশ্রী।

১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর রাতের অন্ধকার শেষে ২২ তারিখের দিনের আলোর আশায় যখন রাতের শেষ প্রহর আর সোনালি সূর্য উদিত হওয়ার রক্তিম আভা পূর্ব আকাশে উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তেমন সময়ে ঘিওর থেকে পাকহানাদার আর তাদের সহযোগীরা আক্রমণ চালায় তেরশ্রী গ্রামে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে হায়েনার দল ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনপাড়ার ঘুমন্ত মানুষের উপর।

ঘর-বাড়িতে আগুন, প্রচণ্ড গুলির শব্দ, চিৎকার আর আর্তনাদে পরিবেশ ভারি হয়ে যায়। আতংকিত গ্রামবাসী প্রাণভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। আত্মরক্ষাও করতে পারে না তারা। হানাদার বাহিনী যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে। বাড়িতে, রাস্তায়, ঝোপে-ঝাড়ে, শিশু, নারী ও বৃদ্ধা, যুবকসহ সবাইকে হত্যা করেছে। আহাজারি আর আর্তচিৎকারে তেরশ্রী গ্রাম ডুবে যায় নারকীয় অবস্থার মধ্যে। পাক বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগীরা দিনের আলো ফুটলে, তাদের মুখে ’মুখোশ’ পরে নেয়।

ভবিষ্যতে সুবিধামতো রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি তাদের মাথায় ছিল বলে। অনেক লোক কোনমতে পালিয়ে বাঁচলেও সেদিন ৪৩ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছিল হায়েনার হাতে নৃশংসভাবে। তেরশ্রী এলাকার উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে তারা হত্যা করে পৈশাচিকভাবে। জমিদার বাবুকে তার শয়ন কক্ষ থেকে বের করে লেপ-কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে।

এ সময় তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান এগিয়ে যান ঘটনাস্থলে। তিনি জানতে চান জমিদার বাবুকে হত্যা করা হচ্ছে কেন? হায়েনার দল তখন অধ্যক্ষ সাহেবকে ধরে নিয়ে আসে তেরশ্রী বাজারে এবং বেয়নেট চার্জ করে। পরক্ষণেই তাকে তার বাসায় নিয়ে শিশুপুত্র এবং স্ত্রীর সামনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তার স্ত্রী বাসার উত্তর পাশের পুকুরে লাফিয়ে পড়ে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচান।

ওই দিন নিহত হওয়ার আগে সাধুচরণ দাস, যিনি হানাদার বাহিনী রাইফেল কেড়ে নিয়ে এ জুলুমের প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শতাধিক অত্যাচারী দলের কাছে তাকেও প্রাণ দিতে হয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত হানাদার বাহিনী এবং দোসররা হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ সম্পন্ন করে ফিরে যায় ঘিওরে। লাশের গ্রামে পরিণত হয় পুরো তেরশ্রী গ্রাম। এ হত্যাযজ্ঞ যারা দেখেছেন তারাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। পরে স্থানীয় হিন্দু মুসলমান মিলে লাশগুলোকে কবর দেয় গণকবরের মতো।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মনে, কেনই বা বেছে বেছে তেরশ্রীকে হানাদাররা টার্গেট করেছিল। এর উত্তর আগেই পাওয়া যায়, অন্ধকারের মধ্যেও আলোক বর্তিকা ছিল তেরশ্রী গ্রাম। কারণ তৎকালীন তেরশ্রী ছিল শিক্ষানুরাগী, হিন্দুপ্রধান, বাম প্রগতিশীল তথা শিক্ষা সংস্কৃতিতে শীর্ষে। জেলার প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ অনেক গুণীজনের জন্ম তেরশ্রীতে। আবার ড. মো. শহিদুল্লাহ্, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সরদার ফজলুল করিম, ড. মোতাহার হোসেন, কবি মনসুর উদ্দিনসহ বহু মনীষীদের আগমনে শ্রী বৃদ্ধি পেয়েছিল তেরশ্রীর।

তাছাড়াও ১৯৭১ সালে আশপাশের অনেক এলাকা থেকে বহু লোক আশ্রয় নিয়েছিল তেরশ্রী গ্রামে। তেরশ্রী ছিল অসহায়, নিরূপায় জনগণের মায়ের কোলের মতো নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তেরশ্রীতে গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। এসব কারণ ছাড়াও দোসররা তেরশ্রীর হত্যাকান্ডটি ঘটিয়ে ছিল আরও বিশেষ কারণে, কারণটি-বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত করতে।

একসময় অর্জিত হয় প্রিয় স্বাধীনতা। ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণতহ্যা দিবসের ভয়াল স্মৃতিকে স্মরণ করার জন্য ১৯৯৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের রাজনৈতিক দল, স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণের সমন্বয়ে গঠিত হয় ’শহীদ স্মৃতি পরিষদ’। শহিদ জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর বিধবাপত্নী গায়ত্রী দেবী চৌধুরানী কর্তৃক একটি স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর।

১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর তেরশ্রীতে আয়োজন করা হয় একটি স্মৃতিচারণ সভার। তেরশ্রী কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয় শহিদ অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান মঞ্চ। প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র তেরশ্রীতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রশিকার নির্বাহী পরিচালক ডা. কাজী ফারুক আহমদ স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন। কিন্তু অজ্ঞাতকারণে কোনটিই নির্মিত হয়নি।

১৯৯৫ সালে মানিকগঞ্জে আনোয়ার চৌধুরী, ইকবাল হোসেন, আজহারুল ইসলাম আরজুসহ বেশ কয়েজন নেতৃবর্গ তেরশ্রীতে আসেন। তাদের নেতৃত্বে এবং তেরশ্রীর সর্বস্তরের লোকজনের সহযোগিতায় ’২২ নভেম্বর’ ঘটনাকে প্রতি বছর স্মরণ করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে আব্দুল হাকিম মাস্টারকে সভাপতি, আব্দুর রহমান ঠাকুর, জমিদারপুত্র সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী, মোশারফ হোসেন মানিকসহ তিনজনকে সহ-সভাপতি, আফতাব উদ্দিন খন্দকারকে সাধারণ সম্পাদক, আমিরুল ইসলামকে সহ-সাধারণ সম্পাদক, মন্তোষ কুমার পালকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট ’তেরশ্রী শহীদ স্মরণ কমিটি’ গঠিত হয়।

উপদেষ্টা করা হয় ব্রিগেডিয়ার আবুল হোসেন, ড. কছিমদ্দুন, ডা. আব্দুস সালামসহ মানিকগঞ্জ শহরের বেশ কয়েকজন নেতাকে এবং ১৯৯৬ সাল থেকেই মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাকে পার্ট-১ এবং তেরশ্রী বিজয় মেলাকে পার্ট-২ করে উদযাপন করা হয়। এক সময় মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক কর্তৃক শহিদ অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানের সিধুনগরের গোরস্থানের কবরটি বাঁধাই করে দেওয়া হয়।

সময়ের আবর্তনে শহিদ স্মরণ কমিটির অনেক রদবদল করা হয়েছে। শহিদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য শহিদ স্মরণ কমিটি, ব্র্যাক গণকেন্দ্র পাঠাগার, তেরশ্রী কলেজ, তেরশ্রী কেএন ইনস্টিটিউশন এবং প্রগতিশীল জনগণের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে শহিদ স্মরণে আলোচনা সভা, মৌন মিছিল ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
তেরশ্রী গণহত্যা দিবসটি নিয়ে বিটিভিসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, বিভিন্ন সংবাদ-প্রতিবেদন প্রচার করে থাকে। ২০১০ সালে ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণহত্যা দিবস স্বরণে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালক ও মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের মাননীয় পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের উদ্যোগে এবং শহিদ স্মরণ কমিটির সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের তত্ত্বাবধানে তেরশ্রীর সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে মৌন মিছিল, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সময় জেলা প্রশাসক মুন্সী শাহাবুদ্দীন আহমেদ, রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালক ও মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের মাননীয় পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, ঘিওর উপজেলার নির্বাহী অফিসার রাজা মো. আব্দুল হাই, ঘিওর থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. আবুল হোসেনসহ স্থানীয় নেতারা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও সর্বস্তরের জনগণ উপস্থিত ছিলেন। তখন এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তেরশ্রীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জোড়ালো দাবি ওঠে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় ২২ নভেম্বর কেন্দ্র করে সঠিকভাবে কোন ইতিহাস রচিত হয়নি আজ পর্যন্ত। স্থানীয়ভাবে ৪৩ জনের মধ্যে ৩৭ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন- জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান, স্থানীয় স্কুলের দপ্তরী মাখন চন্দ্র সরকার, যাদব চন্দ্র দত্ত, তার পুত্র মাধব চন্দ্র দত্ত, সাধুচরণ দাস, শ্যম লাল সূত্রধর, নিতাই চন্দ্র দাস, জগদীশ চন্দ্র দাস, সুধন্য চন্দ্র দাস, সুরেন্দ্র নাথ দাস, প্রাণ নাথ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, সাধন কুমার সরকার, যোগেশ চন্দ্র দাস, রামচরণ সূত্রধর, রাধাবল্লভ নাগ, জ্ঞানেন্দ্র ঘোষ, যোগেশ চন্দ্র সূত্রধর, মো. কছিম উদ্দিন, মো. গেদা মিয়া, একলাছ মোল্লা, শ্যামা প্রসাদ নাগ, নারায়ণ চন্দ্র সূত্রধর, শচীন্দ্রনাথ গোস্বামী, যোগেশ দত্ত, গৌড় চন্দ্র দাস, মো. তফিল উদ্দিন, মনীন্দ্র চন্দ্র দাস, তাজু উদ্দিন, রমজান আলী, দেলবর আলী, ওয়াজ উদ্দিন, শ্যামল সূত্রধর, বিপ্লব সরকার, মহেন্দ্র নাথ দাস, শ্রীমন্ত কুমার দাস।

প্রতি বছরের মতো এবারেও এসেছে ২২ নভেম্বর। আসবে চিরকাল। ৪৩ জন শহিদ ঘুমিয়ে রয়েছে তেরশ্রীতেই। তাদের স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে রয়েছে কেউ কেউ। স্মৃতির মণিকোঠায় হাতড়িয়ে তারা মেলাতে পারে না অনেক কিছুই। স্বজনহারা লোকগুলো স্বপ্ন দেখে তেরশ্রীর ইতিহাস রচিত হবে, সেখানে ধ্রুব তারার মতো জ্বলজ্বল করবে তাদের প্রিয় লোকটির স্মৃতি।

তেরশ্রী শহিদ স্মৃতি কমিটিসহ ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবান্ধব সরকার এবং প্রগতিশীল অনেকেরই উদ্যোগে শহীদ স্মৃতি স্মরণে ঘিওর-দৌলতপুর সড়কের পাশে তেরশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের জায়গাটিতে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে শহিদদের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার্থে শহিদ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে। ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন এমসিএ ও কমান্ডার ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হক।

২০১২ সালের ১৩ নভেম্বর শুভ উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম। সেই সাথে উন্মোচিত হয়েছে তেরশ্রীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রতি বছর ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এএম নাইমুর রহমান দুর্জয় মহোদয়ের নেতৃত্বে দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয় এবং শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

পাক হানাদার বাহিনী ৪৩ জনকে হত্যা করেছিল, কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি। নতুন প্রজন্মকে হৃদয় বিদারক ঐতিহাসিক সেই ঘটনাটি জানতে ও জানাতে হবে। শহিদদের পূণ্য স্মৃতি ধারণ করতে হবে হৃদয়ে। তেরশ্রীবাসীর হৃদয় গোলাপ প্রস্ফুটিত করে অপেক্ষায় আছে ’শহিদ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য’।

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Dailynobobarta
Developed By Dailynobobarta