সিলেট কালিঘাটে সক্রিয় চোরাকারবারি চক্র প্রতিরাতে ঢুকছে ১৫ গাড়ি চোরাচালানপণ্য

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেটের কালিঘাটের পুরনো চোরাকারবারি চক্র আবার সক্রিয় হয়েছে। নতুন কিছু পুলিশ অফিসারকে যুক্ত করে পুরনো চোরাকারবারিরা আবার কালিঘাটের চোরাচালান শুরু করেছে। গত এক সপ্তাহে ৩০ কোটি টাকার চোরাচালানকৃত ভারতের পণ্য কালিঘাটের বাজারে ঢুকেছে।

আরও জড়িত রয়েছেন স্থানীয় কিছু ক্যাডার ও চাঁদাবাজ ভারতীয় এসব চোরাই পণ্যের ‘রিসিভার’ কালিঘাটের চোরাই পণ্যের কিছু ব্যবসায়ী। আর ভারতের এসব পণ্য ডেলিভারি দিচ্ছে হরিপুরের তরিকুল সিন্ডিকেট। কালিঘাটে তিনদিনের গোপন অনুসন্ধানে এসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মোগলাবাজার থানার ওসি ছিলেন। সেখানকার একটি চোরাচালান গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। সেই গ্রুপের সদস্যরা আগে ওসিকে ম্যানেজ করে মুরাদপুর পয়েন্ট থেকে কানাইঘাট রুটে আসা সকল চোরাই ভারতীয় পণ্যের ট্রাক পাস করতো। সেই গ্রুপে জড়িত ছিলেন শাহেদ, ছালেক ও হুসেন। কোতোয়ালি থানার ওসি হয়ে যোগদানের পর থেকেই থানার ভিতর সেই চোরাকারবারিরা একাধিকবার আসা-যাওয়া করে। যা থানার সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। সেই চক্রের ‘অফার’ গিলেছেন ওসি। আগের ওসি মো. জিয়াউল হকের কাছে ঘেষতে পারেনি হরিপুরের তরিকুল সিন্ডিকেট। কিন্তু সিলেটের এক সাংবাদিকের সুপারিশে তরিকুলকে কাছে নেন যশঅসভন ওসি।

গত ২২ অক্টোবর থেকে ওসিকে ম্যানেজ করে টাকা লেনদেন করেন হরিপুরের তরিকুল। এরপর ওসি মো. জিয়াউল হকের বন্ধ করা কালিঘাটের ভারতীয় পণ্যের চোরাচালানের লাইন ওপেন করে দেন ওসি। সেই সঙ্গে চোরাকারবারিদের সঙ্গে এসএমপি পুলিশের কিছু অফিসাররা একজোট হয়েছেন। এই তালিকায় এসএমপির বিভিন্ন ফাঁড়ি ফাঁড়ি ও থানার একাধিক আইসি ও সেকেন্ড অফিসার সম্পর্ক গড়েছেন। আর চোরাকারবারি ও পুলিশের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়েছেন এক সময়ের ছিনতাইকারী বর্তমানে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এক সপ্তাহে ৩০ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য প্রবেশ তরিকুল সিন্ডিকেটে এক সাংবাদিক জড়িত

আসছে পেঁয়াজ, চিনি, আলু, টমেটো ও জিরা ব্যক্তি। কালিঘাটের ব্যবসায়ী সূত্র জানায়, গত ২২ অক্টোবর থেকে সিলেটের কালিঘাটে হরিপুরের তরিকুলের ভারতীয় চোরাচালান পণ্য প্রবেশ করছে। প্রতিদিন ভোর ৪ টা থেকে ৬ টা পর্যন্ত ট্রাক ও ডিআই পিকআপযোগে এসব পণ্য ঢুকে। প্রতি চালানে ৮ থেকে ১৫টি ডিআই পিকআপ থাকে। এসব পিকআপে করে কালিঘাটে প্রবেশ করছে ভারতের আলু, টমেটো, এলসি বড় পেঁয়াজ, জিরা, কসমেটিক্স ও কিটকেট চকলেট। এই কদিনে কালিঘাটে ৩০ কোটি টাকার ভারতের মাল ঢুকেছে।

এসএমপি সূত্র জানিয়েছে, এয়ারপোর্ট থানার ওসি চোরাচালানে নিজে সম্পৃক্ত না থাকলেও তার সেকেন্ড অফিসার ও আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ির জনৈক কর্মকর্তা চারাকারবারিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ি, বন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ও লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়িরও কিছু অফিসারের সঙ্গে চোরাকারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা আছে। এসএমপি ডিবির নতুন ডিসি শাহরিয়ার আলম সকল অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্সে থাকলেও তার নিচের সারির কিছু অসৎ অফিসাররা সিন্ডিকেটে জড়িয়ে প্রতিরাতে ‘লাইন সিগনাল’ দিয়ে চোরাচালান পণ্য পাস করাতে

চোরাকারবারিদের সাহায্য করছেন। ডিবির জড়িত কতিপয় কর্মকর্তা বিদ্যাসাগর ডিবির ডিসির টিমের সিগনাল পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ডিবির দুটি টহল টিমের গাড়ি চালকেরাও এসব চোরাকারবারির কাছে ক্ষুদেবার্তা পাঠাচ্ছেন। তাদের হোয়াটসঅ্যাপ চেক করলে প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। কোতোয়ালি থানার ওসি এয়ারপোর্ট থানার সেকেন্ড অফিসারের সঙ্গে মিলে ভারতের চোরাই পণ্য কালিঘাটে প্রবেশের নেটওয়ার্ক গড়েছেন বলে একাধিক সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।

যেভাবে কালিঘাটে মাল প্রবেশ করে: এসএমপির বটেশ্বর থেকে মুরাদপুর কানাইঘাটি সড়ক ব্যবহার করে চালিবন্দর ও সোবহানিঘাট সড়ক ব্যবহার করছে ভারতীয় চোরাই পণ্যের ডিআই পিকআপ। মাঝখানে পুলিশ ও পাবলিক সিগনাল পাচ্ছে পিকআপের চালক ও সঙ্গে থাকা প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের প্রটোকল বাহকরা। বন্দর কালিঘাটের করিম উল্লাহ মোড়ে একটি তথ্যদাতা চাঁদাবাজ চক্র দাঁড়ানো থাকে। তারাও বস্তা প্রতি হিসাবে একটি ভাগ পেয়ে থাকে। তাদের কাজ হচ্ছে, চাঁদা ২০ হাজার পেলে মাল ভিতরে ঢুকবে, না হলে প্রবেশমুখে মাল আটকিয়ে জটলাপাকানোর ভয় দেখাবে।

হরিপুরের তরিকুল মাল বোঝাই গাড়িগুলো কালিঘাটের ভিতরে জিরা ব্যবসায়ী মিলাদের কাছে জিরা গুদামে পৌঁছে যাচ্ছে। চিনির চালান রুবু বাবুর কাছে যাচ্ছে। বাকি মাল কালিঘাটের ভারতীয় পণ্য বিক্রেতা সাদ্দাম, সিজিল, ইমন ও আনোয়ারের কাছে যাচ্ছে বলে কালিঘাটের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র আরও জানায়, আগে কালিঘাটের ইমন ছিলেন ভারতীয় চোরাচালান পণ্যের ব্যবসায়ীদের ক্যাশিয়ার। বর্তমানে তাকে আড়ালে রেখে নতুন করে কালিঘাটের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী নাঈম ও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী পারভেজকে দিয়ে চোরাই পণ্য মজুদ করা হচ্ছে। এসব পণ্য ডিসকো গল্লির ভিতরে লালদিঘি মাঠে যাওয়ার সময় বামের বিল্ডিংয়ের ২য় তলার গুদামে রাখা হচ্ছে।

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ও এয়ারপোর্ট থানার সেকেন্ড অফিসার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এসবে জড়িত নই। কেউ যদি কালিঘাটে চোরাচালান ঢুকিয়ে থাকে, আমি খবর নিয়ে বন্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, কোতোয়ালি থানা পুলিশকে চোরাচালান দমনে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হবে। আর ডিবি পুলিশ অন্যান্য বিষয়ে ভালো কাজ করেছে। চোরাচালান দমনেও তাদেরকে টহল বাড়াতে বলা হবে।

এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) শাহরিয়ার আলম বলেন, আমরা আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কাজ বন্ধে অভিযান জোরালো করেছি। জুয়াড়িদের আটক করতে অভিযান করেছি। চোরাচালান আটকে টহল ও নজরদারি বাড়াতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পিপিএম (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস) মু. মাসুদ রানা দৈনিক নিরপেক্ষকে বলেন, আমি চোরাচালান বিষয়ে যে অভিযোগগুলো শুনলাম, সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। চোরাচালান দমনে আগের মতো এসএমপি সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। কালিঘাটের চোরাচালান বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিউজ : দৈনিক নিরপেক্ষ

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *