অবৈধভাবে বালু-পাথর খেকোদের থাবায় অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাফলং তার নিজস্ব রূপলাবণ্য হারাচ্ছে ( ভিডিও )

জসিম উদ্দিন, গোয়াইনঘাট (সিলেট) : দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কাল্পনিক দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের অভয়ারণ্য জাফলং। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ ঘেরা এ জনপদ ও প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যপট দেখতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসে ভ্রমণপিপাসু পর্যটক। কিন্তু কালের বিবর্তনে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাফলং তার নিজস্ব রূপলাবণ্য হারাচ্ছে। বালু-পাথর খেকোদের থাবায় জাফলংয়ের সেই আগের দৃশ্যপট এখন আর নেই বললেই চলে। জাফলং জিরো পয়েন্টের পর সম্প্রতি ৩ নম্বর পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের বালিঘাট মন্দিরের জুম নামক স্থান থেকে দিনরাত যন্ত্রদানব ফেলুডার মেশিন দিয়ে দেদার বালু-পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। গত কয়েক দিন আগে লোক দেখানো অভিযানেই দ্বায়সারা উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিনে দেখা যায়, যন্ত্রদানব মেশিন দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে রয়েছে স্থানীয় শ্রীশ্রী কালীবাড়ি মন্দিরসহ অসংখ্য ফসলি জমি, পানের বরজ ও সুপারি বাগান, ছাড়াও জাফলং চা-বাগান এবং বসতবাড়ি। আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দলনে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার পালিয়ে যাওয়ার পরদিন থেকেই উত্তর সিলেটের বৃহৎ জাফলংয়ের পাথর কোয়ারি এবং বিছানাকান্দি পাথর কোয়ারি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক লুটপাটের মহাযজ্ঞ চলে। শুধু জাফলং পাথর কোয়ারি থেকে প্রায় শত কোটি টাকার পাথর লুট হয়। পাথর লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ

ও বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা বাদী হয়ে পৃথক-পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ঘটনার প্রায় কয়েক মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে পাথর লুটপাটকারী মামলার আসামিরা এখনো রয়ে গেছে অধরা। পতিত আওয়ামী লীগের দোসর বিগত সময়ে যারা জাফলংয়ে লুটপাট করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তারা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঐ সব দোসরকে পুনর্বাসনের জন্য নামধারী কিছু বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আড়ালে থেকেই ঐসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

জাফলংয়ের বল্লাপুঞ্জি, মন্দিরের জুম, জিরো পয়েন্ট, বাবুলের জুম এলাকা, বল্লাপুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর জাফলং সেতু সংলগ্ন পাথর কোয়ারি এলাকায় অবৈধভাবে দানব যন্ত্র দিয়ে রাতের আঁধারে বালু-পাথর উত্তোলনের করা হচ্ছে। চোরাইভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে জুমপাড় এলাকায় শ্রীশ্রী কালীবাড়ি মন্দির, বল্লাঘাটের পুরাতন পর্যটন স্পট, বল্লাপুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, শত হেক্টর ফসলি জমি, চা-বাগান, জাফলং সেতু, জাফলং বাজার, নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি গ্রামের বসতবাড়ি ও খাসিয়া সম্প্রাদায়ের, পানসুপারির বাগানসহ আশপাশের এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বালু-পাথর খেকোদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের ভাগবাঁটোয়ারা হওয়ার কারণে প্রশাসন নিরব থাকে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক সঙ্গে মিলেমিশে বীরদর্পে বিভিন্ন ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রদানব দিয়ে মাটি কেটে বালু-পাথর উত্তোলনের কাজ চলমান রেখেছে। স্থানীয় প্রশাসনের লোক দেখানো টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযান পরিচালনাকারী দল ঘটনাস্থল পৌঁছানোর আগেই আগাম খবর চলে যায় বালু-পাথর খেকো চক্রের কাছে। এসব চক্রের সদস্য আওয়ামীলীগ ও বিএনপির নামধারী নেতাদের কাছে আজ পরাস্ত প্রকৃতিকন্যা জাফলং। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোনো আইনগত ব্যবস্থা। অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অবহেলা আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির কারণে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে চা-বাগান, ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে ফসলি জমি ও আবাসস্থল। এসব এলাকা থেকে বালু-পাথর উত্তোলন ও অপসারণ করতে খনিজ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলেও ঐসব নিয়মের কোনো ধারে কাছেই নেই কেউ।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার রতন কুমার অধিকারী বলেন, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেও পাথর খেকোদের থামানো সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ পাথর ও বালু লুটপাটের সঙ্গে জড়িদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও যারা অবাধে জাফলংয়ের সৌন্দর্য বিনষ্ট করছেন তাদের শিগগিরই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

( ভিডিও ) https://www.facebook.com/share/v/1EPcH3cLoD/

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *