মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে আটোয়ারীতে ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা

তরুণ প্রজন্মকে বিপথ থেকে সুপথে আনতে খেলাধূলায় আসক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারীর প্রাক্তন ইউএনও মুসফিকুল আলম হালিম। সে লক্ষ্যে গড়ে একটি অনগ্রসর উপজেলায় গড়ে তুলেন ফুটবল একাডেমি।

শিক্ষার্থীদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে তরুণ-তরুণীদের সামাজিক অবক্ষয় দূরীকরণে ‘ফুটবল একাডেমি’ গড়ে তুলেন বলে জানান এ প্রাক্তন ইউএনও। এ উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন “স্মার্ট বাংলাদেশ” বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন তিনি।

জানা যায়, পঞ্চগড়ে মো: মুসফিকুল আলম হালিম আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর। দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর চলতি সালের জানুয়ারীতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদলিজনিত কারণে বদলী হয়েছেন কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলায়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে বদলে দিয়েছেন অনেক কিছুই।

ইউএনও জানান, হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় জেলার সমতলের ভারতীয় সীমান্তবর্তী উপজেলা আটোয়ারী। শরতের স্বচ্ছ আকাশে উঁকি দেয় নয়নাভিরাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। সমতলে কৃষি সমৃদ্ধ উপজেলা আটোয়ারী যার মাটির নিচে রয়েছে খনিজ সম্পদ পাথর। সমতলে চা বাগানসহ অর্থকরী ফসল ভূট্টা, মরিচ, পাট, গমসহ ব্যাপক পরিমাণে শীতকালীন সবজি চাষাবাদ হয় এখানে। কৃষি নির্ভর এলাকাটিতে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের বসবাস।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে পিছিয়ে আছে উপজেলাটি। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে উদ্যোগের অভাবে তেমন কোন সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। ফলে শিক্ষা সংস্কৃতির দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে উপজেলাটি। যার কারণে দিন দিন বেকার তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে ইলেকট্রনিক ডিভাইস আসক্তিতে ও সামাজিক অবক্ষয়সহ নানা অপকর্মে। পাশাপাশি শরীর চর্চাসহ অন্যান্য বিনোদনের কোন সু-ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষিত বেকার তরুণ মাদকসহ নানা অসামাজিক কার্যক্রমের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

সে কারণে আটোয়ারীতে ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করি। এটির লক্ষ্য হচ্ছে, আটোয়ারী উপজেলা ফুটবল একাডেমি একটি সামাজিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। শিশু, কিশোর ও তরুণদের মেলবন্ধন ও তাদের মাঝে সম্প্রীতির চেষ্টা করা এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি করা। সর্বসাধারণের বিনোদনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা, নীতিমালা প্রণয়ন করে ফুটবল খেলাকে উন্নত ও যুযোপযোগী বিজ্ঞানসম্মত পন্থা অবলম্বন করে মেধাবী ও প্রতিভাবান খেলোয়ার সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা। ফুটবল খেলাকে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেয়া এবং অত্র উপজেলায় মানসম্মত খেলোয়ার তৈরী করা। খেলাধুলার মাধ্যমে যুব শক্তির ব্যবহার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি করা। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে যুব সমাজকে খেলাধুলায় মনোনিবেশ করা। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।

ইউএনও মুসফিকুল আলম হালিম আরও জানান, ফুটবল একাডেমি গড়ার পর থেকে এখন প্রতিদিন বিকালে ফুটবল একাডেমির প্রশিক্ষণ হয়। শিশুরা নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন পরিচালনার দিকে মনোযোগী হয়ে উঠছে। একসাথে খেলার কারণে একটা টিম একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।

এ ফুটবল একাডেমিনে এখন মাঝে মধ্যে গিয়ে প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদেরকে অনুপ্রাণিত করে মতবিনিময় করা হয়। একাডেমির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রæত সমাধানের চেষ্টা করা হয়। শিক্ষক, অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে সবার পরামর্শে দীর্ঘদিন ধরে আটোয়ারীর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে চেষ্টা চলছে। প্রশিক্ষণার্থীরা যাতে সঠিকভাবে খেলাধুলা করতে পারে সেজন্য প্রশিক্ষণ ও ভলো খেলার মাঠ তৈরী করা হয় ও দক্ষ প্রশিক্ষক নির্বাচন করা হয়। তাতে করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও সুস্থ থাকে, মানসিক অবসাদ বা ক্লান্তি দূর হয় সেই কারণেই ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠা করা। এ কাজগুলো করার কারণে শিশু-কিশোর-যুবকদের সাথে আলোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সবসময় তাদের সাথে আলোচনার ফাঁকে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। যাতে তারা বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, মাদক, ক্রিন আসক্তি, পর্ণোগ্রাফি, পিতা-মাতার প্রতি অশ্রদ্ধা, উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদ, সম্প্রদায়িকতার বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং এই সামাজিক সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারে।

উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ও ইউপি চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় প্রতিটি ইউনিয়নেই মিনি লাইব্রেরি করা ও আটোয়ারী ফুটবল একাডেমির তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রীড়া একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এতে সকল স্তরের শিশু-কিশোরেরা সুযোগ পাবে বই পড়ার ও পাশাপাশি খেলাধুলা করার। এতে করে শিশুরাই একদিন ভালো খেলোয়ার হবে ও খেলাটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিবে।

খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খেলাধুলার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি শরীর ও হাড় সুস্থ থাকে। শিশুরা মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানছে তথা শিল্প সাহিত্য ও সংষ্কৃতির উন্নয়ন ঘটছে। ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিশু-কিশোর-যুবকেরা নিয়মিত ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে উঠছে। খেলাধুলা শরীর গঠনের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করে। খেলাধুলার মধ্য দিয়েই চরিত্র গঠন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, মেধা বিকাশের সুযোগ ঘটবে। খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতার জন্য ক্রীড়ার মাধ্যমে তরুণদের মনে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়। এরাই একদিন ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

উপজেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়া আটোয়ারী উপজেলা ফুটবল একাডেমিতে খোঁজ রাখতে হবে ও প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থীদের অনুপ্রাণিত করা চালিয়ে যেতে হবে। প্রতি মাসেই একাডেমির টিম নিয়ে অন্যত্র বিভিন্ন দলের সাথে খেলার আয়োজন অব্যাহত রাখতে হবে। খেলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত সভার আয়োজন করতে হবে। চিহ্নিত সমস্যাগুলোকে দ্রæত সমাধান করতে হবে।

আর এর জন্য প্রয়োজন হয় অর্থের। সরকারিভাবে কিছুটা সহযোগিতা করা গেলেও স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা খুব দরকার। তাই ফুটবল একাডেমির নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতি মাসে বা বছরে অথবা এককালীন আর্থিক সহযোগিতা করে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবেন বলে আমি আশা করি। সরকারিভাবে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে এই একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব হবে। তরুণ প্রজন্মকে বিপথ থেকে সুস্থ বিনোদনে আনতে ইউএনওর ফুটবল একাডেমির এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ থেকে সচেতন নাগরিকমহল। এটি এগিয়ে নিতে চান বর্তমান প্রশাসন ও পরিষদ এমনটি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *